সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ১২:৫৯ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে প্রাণঘাতী হাম। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর সাতজন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার (১০ মে) পর্যন্ত ৫৫ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৬৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৩৪৪ জনের। একই সময়ে নতুন করে ২৮২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠায় সরকার দেশব্যাপী টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। তবে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়েছে বলে জানিয়েছে UNICEF।
সংস্থাটির তথ্যমতে, শহরাঞ্চলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু এখনো হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি। দ্রুত টিকাদান পরিস্থিতি যাচাই পদ্ধতি বা আরসিএম বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৫০৩ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২৭৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ২০৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে এ পর্যন্ত মারা গেছে ১৩৮ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৭৮, বরিশালে ২৯, চট্টগ্রামে ২৭, ময়মনসিংহে ২৬, সিলেটে ২৪, খুলনায় ১৪ এবং রংপুর বিভাগে চারজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪৯ হাজার ১৫৯ জনে। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৮১৯ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
শিশু বিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, শ্বাসকষ্ট, বুক দেবে যাওয়া, খিঁচুনি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বারবার বমি কিংবা তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
অন্যদিকে মাহবুবুল হক জানান, জ্বরের পর শরীরে র্যাশ দেখা দিলে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না। তবে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটায় দীর্ঘদিন পর আবারও ভয়াবহভাবে ফিরে এসেছে হাম।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারণে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হলে তা দ্রুত রোগের বিস্তার ও পুনরুত্থানের ঝুঁকি বাড়ায়, বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রতিফলন। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ টিকাদান কাভারেজ বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করলেও সাম্প্রতিক সময়ে হাম পরিস্থিতির অবনতিকে কেন্দ্র করে টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে, যা পরবর্তীতে রোগ প্রতিরোধে দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে।
ক্রয়পদ্ধতি বদলাতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জরুরি টিকার মজুত না রেখেই বন্ধ করে হাম ও পোলিওর মতো রোগের টিকা। জরুরি টিকা কেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বিপদজনক হতে পারে জানিয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ। কিন্তু তা আমলে নেয়নি সরকার। এ কারণেই এক সময় প্রায় নির্মূল হওয়া হাম ভয়ংকর রূপে ফিরেছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞের।
একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতিতে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।